শনিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৩

প্রত্যেক মানব জাতির জন্য হক্কানি পীরের হাতে বায়াত গ্রহণ অপরিহার্য

: সেলিম ভান্ডারী :  মহান আল্লাহ তায়ালা কোরআনুল কারিমে বলেছেনÑ নিশ্চয়ই যারা আপনার হাতে বায়াত করছে; নিশ্চয়ই তারা আল্লাহর হাতে বায়াত করছে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর। সুতরাং, তারা যদি এটা ভঙ্গ করে, তবে তারা স্বীয় জীবনের ওপর তা ভঙ্গ করে এবং যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা রক্ষা করেছে, আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদের দেবেন অতি মহান পুরস্কার। (সূরা ফাতহ-১০আয়াত)। সুতরাং নিজের জীবন গঠনে আল্লাহ প্রাপ্তির সহজ উপায় হিসেবে তরিকতের পীর ও হক্কানি উস্তাদের হাতে বায়াত গ্রহণ করা অপরিহার্য। এ বিষয়ে মুসলিম শরীফে রয়েছে ‘যে ব্যক্তি বায়াত এর বন্ধন, সংঘ ও নেতার প্রতি আনুগত্যের শপথ ছাড়া মারা গেল, সে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের মৃত্য বরণ করল’। এছাড়াও বায়াত হওয়া মানে অন্যতম মানুষ হবার একটি প্রধান রাস্তা। শুধু তাই নয়, সকল মানুষের বায়াত হওয়া অবশ্যই ফরজ। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে বায়াত হওয়াটা কি আসলেই ফরজ? তার আগে আমাদের বোঝতে হবে বায়াত বলতে কি বুঝায়? ইসলামের মূল ৫টি ভিত্তি হলো : ১। নামাজ, ২। রোজা, ৩। হজ্ব, ৪। যাকাত, ৫। কলেমা। এই ৫টি ভিত্তি ছাড়াও আগে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে ‘ঈমান’। ইসলাম ধর্ম মতে প্রথম কাজ হলো ঈমান আনা, অর্থাৎ আল্লাহ্ এক তাঁর কোন শরিক নাই, মোহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, ফেরেস্তায় ও আখেরাতে বিশ্বাস স্থাপনই হলো ঈমান। ঈমান ছাড়া আপনি মুসলমান হতে পারবেন না। ঈমানের সমার্থক শব্দ হলো প্রক্ষান্তরে বায়াত, নবীজী ( সাঃ ) -এর যুগে সকলে নবীজী (সাঃ) এর নিকট বায়াত হয়েছেন, এখন নবীজী (সাঃ) নাই, কিন্তূ ‘উলিল আমর’ আছেন, একজন উলিল আমর হচ্ছেন- স্রষ্টার প্রতিনিধি, যাদের আমরা পীর-মুর্শিদ নামে জানি। কেউ যখন কোন পীর-মুর্শিদের হাতে হাত রেখে বায়াত হন, তখন তিনি সরাসরি স্রষ্টার হাতেই হাত রেখে বায়াত হন। বায়াত হচ্ছে ঈমানের মূল বিষয় গুলোর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা, ঈমানের মূল বিষয় গুলোর উপর বিশ্বাস স্থাপনের শপথ নেওয়া। এ বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে প্রভূর নিকট নিজেকে পরিপূর্ণ ভাবে সমর্পণ করা। ঈমানের পূর্ণ আনুগত্য করাই হলো বায়াত। বিশ্বাসে যদি ফাঁক থাকে তবে কোন কাজেই উন্নতি সম্ভব নয়। "বায়াত" নিয়ে আমাদের আরও বিশদ আলোচনার দরকার। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সর্বশেষ নবী বা রাসুল। মহান আল্লাহ আদম জাতি সৃষ্টি করার পর তাদের হেদায়েত এর জন্য যুগে যুগে বিভিন্ন নবী বা রাসুল প্রেরণ করেছেন। যেহেতু আমাদের নবী ছিলেন সর্বশেষ, তাঁর পর আর কোন নবী আসবেন না বা আসার প্রয়োজনও নাই, কেননা আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য জীবন বিধান পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। তা ছাড়া, আমরাই হলাম সর্বশেষ নবী'র সর্বশেষ উম্মত। আসলে ইসলামের দৃষ্টিতে বায়াত হচ্ছে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুলের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের শপথ। কোন অজুহাত না দেখিয়ে হুকুম পালন করা। রাসুল (সাঃ) এর সময় যারা অজুহাত দেখাতো তাদের মুনাফিক বলা হতো। আসলে বায়াত হচ্ছে নিজেকে স্রষ্টার পুরোপুরি সমর্পণের আনুষ্ঠানিক ও অলঙ্ঘনীয় স্বীকৃতি ও শপথ। ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা পুরোপুরি সমর্পিত (বায়াত) না হয়ে মারা যেও না।’-(আল ইমরান: ১০২ আয়াত)। বায়াতের মাধ্যমে গঠিত হয় সৎসঙ্ঘ। পবিত্র কোরাআনের দৃষ্টিতে সৎসঙ্ঘে সঙ্ঘবদ্ধ থাকা এবং নেতার নির্দেশ অনুসরণ করাও ফরজ। বিদায় হজে নবীজী (সাঃ) পাঁচটি কাজের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিঁনি বলেছেন-‘ নামাজ কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, রোজা রাখবে, হজ করবে আর সঙ্ঘবদ্ধভাবে নেতাকে অনুসরণ করবে ( এখানে বায়াতের কথা বুঝিয়েছেন), তা হলে তোমরা জান্নাতে দাখিল হতে পারবে।’ আশা করি উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝতে পারবেন -“বায়াত হওয়া কি ফরজ, না কি ফরজ না?” " বায়আ'ৎ"- আরবী শব্দটি আভিধানিক দৃষ্টিতে 'বাইউন" শব্দের অনুরূপ, যাহার অর্থ বিক্রয় করা। বিক্রয় ক্ষেত্রে ক্রয়ও হয়। এক পক্ষ হইতে বিক্রয় অপর পক্ষ হইতে ক্রয়। উভয়ের কার্যকে আরবীতে "মোবায়াআ'ৎ" বলা হয়। ইসলামের পরিভাষায় "বায়আ'ৎ" বলা হয়। কোন মহানের হস্ত ধারণ করিয়া বিশেষ প্রতিজ্ঞা বা অঙ্গীকারের উপর দীক্ষা গ্রহণ করা। এই ক্ষেত্রেও দুই পক্ষ। হস্ত ধারণকারী, অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞাকারী, অপর পক্ষ হলো যাহার হস্ত ধারণ করা হয়, যার কাছে অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞা করা হয়। এই ক্ষেত্রেও উভয়ের কাজ "মোবায়াআ'ৎ" বলা হয়। ক্রিয়াপদও ঐরূপ হইবে। ইসলামে যে বায়াত হয় সেই বায়াত কোনো মহান মানুষের হস্তেই ধারণ করা হয়। যেমন: সাহাবীগণ নবীজীর হস্ত ধারণ করিতেন এবং তদ্রুপ কোনো পীর বুজুর্গের হস্ত ধারণ করা হয়। কিন্তু ইসলামের বায়াতকে কঠোরতর সাব্যস্তকরন উদ্দেশ্যে পবিত্র কোরআন স্পষ্ট বলা হইয়াছে যে, এই বায়াতে যদিও কোনো মানুষের হস্তধারণ করা হয়, কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে আল্লাহ্র হস্ত ধারণ গণ্য করিবে। (বুখারী শরীফ হইতে উদ্ধৃত)। আল্লাহ পাক এরশাদ করেছেন, "তোমরা আল্লাহর ও তাঁর রাসুলের এবং প্রাজ্ঞ নেতার আনুগত্য কর"। এখন তো রাসুল (সাঃ) আমাদের মাঝে নেই তাই আমাদেরকে প্রাজ্ঞ নেতার আনুগত্য করতে হবে। আর এটিই হল বায়াত এবং এটি অত্যন্ত জরুরী। যেমন সাহাবায়ে কেরামরা রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে বায়াত গ্রহণ করেছেন। এর পরবর্তীরা সাহাবায়ে কেরামদের কাছে। এবং এর পরবর্তীরা তাবেয়ীন, তাবঈ-তাবেয়ীনিদের কাছে। এভাবে ওস্তাদ শিষ্য বা পীর মুর্শিদের মাধ্যমে বায়াতের সিলসিলা আজো প্রচলিত আছে। তবে মাঝখানে এসে এর থেকে বেশ কিছু ধারা বেরিয়েছে। যেমন- কাদরিয়া, চিশতিয়া, মোজাদ্দেদিয়া, সোহরাওয়ার্দিয়া, নকশবন্দিয়া ইত্যাদি। ১। কুরআন শরীফ-এ আল্লাহ পাক তিনি এরশাদ করেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক উনার রহমত মুহসিন বা আল্লাহওয়ালাগণদের নিকটে।” (সূরা আ’রাফ : আয়াত শরীফ ৫৬)। ২। পবিত্র কুরআন শরীফ এ উল্লেখ রয়েছে, কামিল মুর্শিদের গুরুত্ব সম্পর্কে কালামুল্লাহ শরীফ-এ এরশাদ হয়েছে, “আল্লাহ পাক যাঁকে হিদায়েত দান করেন, সেই হিদায়েত পায়। আর যে ব্যক্তি গুমরাহীর মধ্যে দৃঢ় থাকে, সে কোন ওলীয়ে মুর্শিদ (কামিল শায়খ বা পীর) উনার ছোহবত লাভ করতে পারে না। (সূরা কাহাফ - ১৭) । ৩। আল্লাহ পাক বলেন, “তোমরা সব আল্লাহওয়ালা হয়ে যাও”। (সূরা ইমরান-৭৯)। ৪। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কালাম পাক-এ এরশাদ করেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ পাককে ভয় করো এবং ছাদিক্বীন বা সত্যবাদীগণের সঙ্গী হও।” (সূরা তওবা- ১১৯ আয়াত) এখানে ছাদিক্বীন বলতে ওলী-আল্লাহ গণকেই বুঝান হয়েছে। ৫। আল্লাহ পাক কুরআন শরীফে আরো বলেন, “আল্লাহ পাক এর রাসুলের ইত্বায়াত কর এবং তোমাদের মধ্যে যারা (উলিল আমর) আদেশদাতা, তাদের অনুসরণ কর”। ৬। আল্লাহ পাক বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আমাকে পাওয়ার জন্য উসিলা তালাশ কর”। ৭। পবিত্র কুরআন শরীফ আরো উল্লেখ রয়েছে, আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, “আপনি নিজেকে উনাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন, যাঁরা সকাল-সন্ধ্যায় উনাদের রবকে ডাকে উনার সন্তুষ্টি হাছিলের জন্য। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাকের সন্তুষ্টি হাছিলের জন্য ক্বলবী যিকির করেন, তিঁনার অনুসরণ ও ছোহ্বত (সাক্ষাত) এখতিয়ার করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (সূরা কাহাফ- ২৮)। ৮। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়ছে, “হুযুর পাক (সাঃ) বলেন, আদম সন্তানের শরীরে এক টুকরা গোস্ত আছে যদি সেটা শুদ্ধ হয়ে যায় তবে সমস্ত শরীর শুদ্ধ হয়ে যায়। আর যদি সেটা অশুদ্ধ হয় তাহলে সমস্ত শরীর অশুদ্ধ হয়ে যায়, সাবধান ওটা হচ্ছে ক্বলব”। (বুখারী শরীফ)। ৯। মহান আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, “যার ক্বলবে আমার যিকির জারি নেই সে নফসের অনুসরণ করে এবং তার আমলগুলো হয় শরীয়তের খিলাফ”। ১০। আল্লাহ পাক কুরআন শরীফে বলেন, “সাবধান! আল্লাহ পাকের যিকির দ্বারা দিল ইতমিনান হয়”। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “শয়তান আদম সন্তানের কলবের উপর বসে, যখন আল্লাহ পাকের যিকির করে তখন পালিয়ে যায়, আর যখন আল্লাহ পাকের যিকির থেকে গাফিল হয় তখন শয়তান ওয়াসওয়াসা দেয়”। ১১। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক (সাঃ) হাদীছ শরীফ-এ এরশাদ করেন, “প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য (জরুরীত আন্দাজ) ইলম অর্জন করা ফরয। (বায়হাক্বী, মিশকাত, মিরকাত, লুময়াত, তা’লীকুছ্ ছবীহ্, শরহুত্ ত্বীবী, মোযাহেরে হক্ব, আশয়াতুল লুময়াত)। ১২। হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন হুযূর পাক (সাঃ) বলেন, “ইলম দু’প্রকার- (১) ক্বলবী ইলম অর্থাৎ ইলমে তাছাউফ। আর এটাই মূলতঃ উপকারী ইলম। (২) যবানী ইলম অর্থাৎ ইলমে ফিক্বাহ্, যা আল্লাহ্ পাক, উনার পক্ষ হতে বান্দার জন্য দলীল। (দারিমী, তারগীব ওয়াত তারহীব, তারীখ, আব্দুল বার, দাইলামী, বায়হাক্বী, মিশকাত, মিরকাত, শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ্ ছবীহ্, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, মুযাহিরে হক্ব)। সকলেই একমত যে, ইলমে তাছাউফ অর্জন করার মাধ্যমে অন্তর পরিশুদ্ধ করতঃ হুযূরী ক্বলব হাছিল করা তথা অন্ততঃপক্ষে বিলায়েতে আম হাছিল করা ফরয। এ ফরয ততক্ষণ পর্যন্ত আদায় করা সম্ভব হবেনা, যতক্ষণ পর্যন্ত একজন কামিল মুর্শিদের নিকট বাইয়াত না হবে। তাই বাইয়াত গ্রহণ করাও ফরয। ১৩। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ “তাফসীরে মাযহারীতে উল্লেখ আছে যে, “যে কাজ বা আমল ব্যতীত ফরযসমূহ আদায় করা সম্ভব হয়না, উক্ত ফরযগুলোকে আদায় করার জন্য সে কাজ বা আমল করাও ফরয”। ১৪। হানাফী মায্হাবের মশহুর ফিক্বাহর কিতাব “দুররুল মুখ্তারে উল্লেখ আছে, “যে আমল ব্যতীত কোন ফরয পূর্ণ হয়না; উক্ত ফরয পূর্ণ করার জন্য ঐ আমল করাটাও ফরয”। উল্লিখিত উছুলের ভিত্তিতে সুস্পষ্টভাবে এটিই প্রমাণিত হয় যে, ফরয পরিমাণ ইল্মে তাছাউফ যেহেতু অর্জন করা ফরয, আর তা যেহেতু কামিল মুর্শিদ বা পীর সাহেবের নিকট বাইয়াত হওয়া ব্যতীত অর্জন করা সম্ভব নয়, সেহেতু একজন কামিল মুর্শিদ অর্থাৎ যিনি সর্বদা আল্লাহ্ পাক (সাঃ)’র যিকিরে মশগুল, তিঁনার নিকট বাইয়াত গ্রহণ করাও ফরয। ১৫। সুলতানুল আরিফীন, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি, সাইয়্যিদুত্ ত্বায়িফা হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হুজ্জাতুল ইসলাম, হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহিসহ আরো অনেকেই বলেন যে, “যার কোন পীর বা মুর্শিদ নেই তার মুর্শিদ বা পথ প্রদর্শক হলো শয়তান”। (ক্বওলুল জামীল, নুরুন আলা নূর, তাছাউফ তত্ত্ব)। ১৬। হাদীছ শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা কার নিকট থেকে দ্বীন শিক্ষা করছ, তাকে দেখে নাও”। (মুসলিম শরীফ)। তাই, ইসলাম কখনও বলে না যে তোমরা কোন ওলী-আল্লাহর কাছে যেও না, বরং তাঁহাদের কাছে যাওয়ার জন্যই নির্দেশ করা হয়েছে। ১৭। আল্লাহ পাক বলেন, “যদি তোমরা না জান, তবে আহলে যিকির বা আল্লাহওয়ালাগণকে জিজ্ঞেস করে জেনে নাও”। (সূরা নহল-৪৩ ও সূরা আম্বিয়া-৭ আয়াত)।

শুক্রবার, ২৫ অক্টোবর, ২০১৩

আল্লাহর ওলিরা মানুষকে অন্ধকার জগৎ থেকে আলোর জগতে ফেরান

: সেলিম ভান্ডারী : যুগে যুগে কালে কালে মহান রাব্বুল আলামিন তাঁর বন্ধুরুপে প্রেরণ করিয়াছেন নবী-রাসুল ও ওলি-আউলিয়াগনকে। যাঁরা আদি থেকে এ পর্যন্ত শুধু মানুষকে পাপ পঙ্কিলতা অন্ধকার জগৎ থেকে আলোর জগতে ফেরাতে সচেষ্ট হয়েছেন। আল্লাহর প্রতিনিধি হলেন নবী-রাসুলগন আর নবী-রাসুল গণের প্রতিনিধি হলেন ওলি-আউলিয়াগন। আমরা এ পর্যন্ত জেনে এসেছি ওলি শব্দের অর্থ- আল্লাহর বন্ধু। এ ছাড়াও ওলি-আউলিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে পীরে কেবলা মুর্শিদে কামেল হযরত শাহ্ সূফী গাউসুল আজম বাবাজান কামাল- ডাঃ নূরুজ্জামান মাইজ ভান্ডারী(কেঃ কাঃ) জানান, ওলি অর্থ- নূর বা আলো। কারণ ওলিরা হলেন প্রদত্ত আলো স্বরুপ। যাঁদের মহান আল্লাহ্ তা’য়ালা আলো রুপেই দুনিয়াতে প্রেরণ করিয়াছেন আঁধারকে দুরীকরণের জন্যে। এ ছাড়াও আল্লাহর নূরে নূরান্বিত হয়েই কামালিয়াত বা ওলিত্ব অর্জন হয়। বিধায় নূর শব্দের অর্থই হলো আলো। আর যাঁরা এই আলোয় আলোকিত হয়ে দুনিয়াতে এসেছেন তাঁদের আলোর ছোঁয়ায় অনেক অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষ আলোর পথে ফিরেছেন। আওলিয়া শব্দটি ওলি শব্দের বহুবচন। ওলি একবচন আর আওলিয়া বহুবচন। পবিত্র কোরআণ মাজিদে ১০ নং সূরা ইউনুস ৬২-৬৩ আয়াতে মহান রাব্বুল আলামিন বলেছেন- “আলা ইন্না আওলিয়া আল্লাহি লা খাওফুন আ’লাইহিম ওয়া লাহুম ইয়াহ্ঝানুন। আল্লাযীনা আ’মানূ ওয়া কানূ ইয়াত্তাকানূন”। জেনে রাখ নিশ্চয়ই আল্লাহ্র ওলিদের কোন ভয় নাই এবং তাহারা দুঃখিতও হবে না। যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে। এ ছাড়াও ৩ নং সূরা আল্ ইমরান ৬৮ নং আয়াতে বলোছেন- “ওয়াল্লাহু ওয়ালীউল মু’মিনীন”- আর আল্লাহ্ মু’মিনদের অভিভাবক। ৪৫ নং সূরা জাসিয়া ১৯ নং আয়াতে বলেছেন- “ওয়াল্লাহু ওয়ালীউল মুত্তাকীন”- আর আল্লাহ্ মুত্তাকীদের বন্ধু। মানুষ যখন আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনেন তখন আল্লাহ্তা’লা মু’মিনদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন অর্থাৎ মু’মিনদের অভিভাবক হয়ে যান। এই বান্দাই যখন আল্লাহ্র বন্দেগীতে নিবেদিত প্রাণ হয়ে তাকওয়ার অধিকারী হন তখন আল্লাহ্তা’লা তার বন্ধু হয়ে যান আল্লাহ্র ওলি- আউলিয়া সকল দেশের সকল মানুষের কাছে খুবই পরিচিত দুটি শব্দ। আমাদের দেশেও এ কথাটি বেশ প্রচলিত আছে যে, অমুকে আল্লাহ্র ওলি বা অমুক আল্লাহ্র ওলি। এই আল্লাহ্র ওলিদের সম্পর্কে আমাদের মধ্যে অনেকের ধারণা তারা কোন না কোনভাবে অতি প্রাকৃতিক কোন মতার অধিকারী। যাঁদের মাধ্যমে আল্লাহ্ তা’য়ালা পৃথিবীতে অনেক মুজেজা দেখিয়েছেন। যাঁর মাধ্যমে তাঁরা অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করে অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছেন। আবার অনেকেই মনে করেন আল্লাহ্তা’য়ালা তাদেরকে কোন বিশেষ মতার অধিকারী করে দিয়েছেন, যে মতার বলে অতি প্রাকৃতিকভাবে যে কোন মানুষের মঙ্গল সাধন তারা করতে পারেন, যদি তারা ইচ্ছা করেন। এদেশে সাধারনতঃ পীর দাবীদার শ্রেণীটির মধ্যে আল্লাহ্র ওলি কথাটির প্রচলন বেশি দেখতে পাওয়া যায়। অনেকে আবার আরেকটু বেশি মর্যাদা সম্পন্ন হবেন হয়তো, তাই তারা বলেন ওলিয়ে কামেল অর্থাৎ পরিপূর্ণ ওলি। এর বাস্তব উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় আমাদের এই ভু-খন্ডে ৩৬০ জন ওলির পদার্পণ ঘটেছে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন হযরত শাহ্জালাল (রঃ), হযরত শাহ্ পরাণ (রঃ), হযরত শাহ্ মাকদুম (রঃ), হযরত শাহ্ দৌলা (রঃ), হযরত বায়েজীত বোস্তামী (রঃ), হযরত শাহ্ এনায়েত পুরী (রঃ), সৈয়দ আহাম্মদ আলী মাইজ ভান্ডারী (রহঃ) আরও শত শত ওলি-আউলিয়ার অবস্থান রয়েছে এই বাংলাদেশে। নয়া জামানার আউলিয়ায়ে সৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজ ভান্ডারী(রঃ), হযরত বাবা কামাল উদ্দিন মাইজ ভান্ডারী(রঃ) সহ আরও অনেকে।

বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৩

কামেল ওলীর অনুগ্রহ লাভে ধন্য হবার জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলী

বাবা ভান্ডারী ডটকম :: প্রকৃতপক্ষে, খোদার দিদার ও ওলীর ছোহবত লাভে ধন্য হতে হলে একজন খোদাপাগল কামেল পীরের হাতে বায়াত গ্রহণ করতে হবে। শয়নে, স্বপনে, জাগরণে, সকল অবস্থায় কামেল পীরকে স্মরণ রাখতে হবে। কামেল পীরের প্রতি আনুগত্য থাকতে হবে। বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে সকল অবস্থায় মিথ্যাকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করতে হবে। হারাম খাদ্য ভক্ষণ ও অবৈধ রুচি চিরতরে বর্জন করতে হবে। হালার রুজির তালাশ করতে হবে। কারো প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ ইত্যাদি পোষণ করা কিংবা ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অপব্যয়কে বর্জন করতে হবে এবং কার্পণ্য করা চলবে না। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যকে সমূলে পরিত্যাগ করতে হবে। মৃত্যুর কথা স্মরণ করতে হবে এবং মৃত্যুকে নিকটবর্তী জানতে হবে। মাতা-পিতার ভালবাসা অর্জন করতে হবে। প্রতিদিন রাত্রে শয়নের প্রাক্কালে আত্ম-সমালোচনা করতে হবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য ‘তওবা’ করতে হবে। সকল প্রকার লোভকে হারাম করতে হবে।

পরমুখাপেক্ষীতা বর্জন করতে হবে এবং স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা চালাতে হবে। সকল বিপদে আপদে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং খোদার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে হবে। পূরণ করা যাবে না এরূপ প্রতিশ্রুতি দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। সত্যিকারের জ্ঞাণ আহরণ করতে হবে এবং গোঁড়ামীর উর্ধ্বে উঠতে হবে। ন্যায়ের প্রতি দৃঢ় থাকতে হবে। খোদার খানের কাছে নিজের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণরূপে বিলীন করে দিতে হবে। প্রকৃতপক্ষে “ঐ ব্যক্তিই সফলকাম যার জ্ঞান বিশ্বাস পর্যন্ত, বিশ্বাস আল্লাহর ভয় ভীতি পর্যন্ত এবং আল্লাহর ভয় আমল পর্যন্ত, আমল পরহেজগারী পর্যন্ত, পরহেজগারী খোদার নৈকট্য লাভ পর্যন্ত এবং খোদার নৈকট্য লাভ প্রত্যক্ষ দর্শন পর্যন্ত” {হযরত জোনায়েদী বাগদাদী (রঃ)}। হযরত রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “যে নিজেকে চিনেছে, নিশ্চয়ই সে খোদাকে চিনেছে”। সুতরাং প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য হলো কামেল ওলীকে পীর ধরা, তাঁর আদেশ উপদেশ মেনে চলা এবং মৃত্যুর কথা স্মরণপূর্বক মুরশিদের সাহচর্যে থেকে এবাদত, রেয়াজত, জিকির, মোরাকেবা, মোশাহেদা করা, তজকিয়ায়ে নফছ ও তজকিয়ায়ে কলব হাসেল করতঃ খোদা প্রাপ্তির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা। কারণ ‘এছলাহে নফছ’ বা নফছের সংশোধনপূর্বক ‘হুজুরী’ কলব হাসেল করতঃ আল্লাহতালার সন্তুষ্টি বা নৈকট্য লাভ করাই প্রত্যেক মানুষের একান্ত কর্তব্য।
আজ মূল্যবোধের অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করেছে। ইহার পরিণাম অতীব ভয়াবহ। অপ্রয়োজনীয় ও কুরুচিপূর্ণ ভূষণকে ফ্যাশন মনে করে চরিত্র বিনষ্টকারী আমোদ প্রমোদ এবং স্বাস্থ্য হানিকর পানীয়তে অভ্যস্থ হয়ে সমাজের এক বৃহৎ অংশ আজ কলুষিত। এ সকল নোংরা আচার ব্যবহার ও রীতিনীতির ফলে মানুষের কোমল মন বিলুপ্ত হয়ে মানবমন কঠোর ও নিষ্ঠুর হয়ে পড়ে এবং পশু সুলভ কামনা বাসনায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। তাই একটি সুখী সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণের জন্য অনন্ত শান্তির ফোয়ারা হযরত রসূল করিম (সঃ)-এর সুন্নাহর অনুসরণকারী কামেল ওলীর ছোহবত ও সান্নিধ্য একন্ত প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে, ধর্ম হচ্ছে শরীয়ত, তরিকত, হাকীকত ও মারফতের একটি সমন্বিত রূপ। মারফত হচ্ছে একটি অনন্য মহাসাগর। এ মহাসাগরে ডুব দিতে হলে অন্তর পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং প্রেম ও ভক্তির রসে সিক্ত করতে হবে। শরীয়ত, তরিকত ও হাকিকতকে মহাসাগর মুখী সাগরের সাথে তুলনা করা যায়। মারফতের মহাসাগরে পৌছতে হলে সমূদ্রগুলোকে প্রেম ও ভক্তির বারিধারা দিয়ে পরিপূর্ণ রাখতে হবে। অন্তর পরিচ্ছন্ন না হলে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ভক্তি আসবে না। আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ভক্তি না থাকলে ঈমান হবে অসার, নামায হবে ব্যায়াম, রোজা হবে নিছক উপবাস, হজ্জ্ব হবে বিদেশ ভ্রমণ, যাকাত হবে অহংকারের নিদর্শন এবং বিদ্যা হবে নারীদের অলঙ্কারের ন্যায় অনুৎপাদনশীল। মনে যদি পবিত্র প্রেমের স্পর্শ না থাকে, উহা যদি কুটিলতা ও শঠামিতে পরিপূর্ণ থাকে তাহলে ঐ মানুষকে দোযখে টেনে নেবে। আল্লাহ আমাদের ভন্ড ও কপ পরিচয়ধারীদের হাত থেকে রক্ষা করুন এবং সুফী দর্শনের সত্যিকার ভাবধারায় উজ্জ্বীবিত হবার তওফিক দিন। আমিন!

মনসুর হেল্লাজ:রাষ্ট্র ও ধর্মের হাতে নিহত সূফী

বাবা ভান্ডারী ডটকম ::রহস্যময়তা নয়, আমাকে টানে রহস্যের পেছনের মানুষগুলো । মনসুর হেল্লাজ(858-913 খ্রী:) আমাকে টানে সেই প্রথম কৈশোর থেকে । মনসুরের দর্শন ব্যখ্যা আমার এ লেখার উদ্দেশ্য নয় । হয়তো সাদিক বিস্তারিত লিখবে কোনোদিন । আমি শুধু লিখতে চাইছি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ধর্মকি করে রেহাই দেয়নি একজন সূফীকে ও শুধু তার ভিন্নমতের জন্য ।

আমরা কি খুব সামনে এগিয়ে এসেছি সেই দু:সময় থেকে?
]
………………………………………………………………………….
মনসুর হেল্লাজের আধ্যাতি্নক শিক্ষা পূর্নতা পেয়েছিল বাগদাদে এবং সে সময়ের প্রধান ধমীর্য়পুরুষ হযরত জোনায়েদ-আল-বাগদাদীর সানি্নধ্যে ।
সে সময়ে মুসলিম বিশ্বের শাসক ছিলেন আব্বাসীয় খলিফাগন ।
আধ্যাতি্নক পুরুষ হিসেবে মনসুর অনন্য ছিলেন তার প্রকাশ ভংগীমায় ।অন্যান্য সুফী-দরবেশগন যেখানে ধর্মের গুঢ় তত্ব সাধারন মানুষের সাথে আলোচনা করতেননা,নিজেদের রহস্যময়তার ভেতর রাখতেন,সেখানে মনসুর ছিলেন বিপরীত । মনসুর মারফতের সব জটিল ও অলৌকিক ব্যপারগুলো খোলামেলা আলোচনা করতেন সাধারন মানুষের সাথে । অন্য ান্য ধমর্ীয় স্কলার দের চেয়ে বরং সাধারন মানুষের সাথে তিনি আল্লাহ ও তার প্রেমময়তা নিয়ে কথা বলতেন বেশী ।
বাগদাদের রাস্তায় রাস্তায় তিনি বলে বেড়াতেন:
‘আমি তোমাকে খুঁজতে গিয়ে আমাকে ফিরে পাই। এতো নিকটে তুমি যে আমি আমার থেকে তোমাকে আলাদা করতে পারিনা’
‘আমার অন্তরাত্না মিশে গেছে তোমার মাঝে,খুব সনি্নকটে অথচ অনেক দূরে…যেন তুমিই আমি যেমন আমি হয়ে গেছি তোমার’
এর ফলে মনসুর সাধারন মানুষের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠলে ও তৎকালীন অন্য সব ধর্মীয় গুরুগন তার উপর ক্ষেপে উঠেন । তারা মনসুরের বিরুদ্ধে আধ্যাতি্নক রহস্য জনসম্মুখে প্রকাশের অভিযোগ আনেন । এমনকি তার শিক্ষক হযরত জোনায়েদ ও তাকে সতর্ককরে দেন সাধারন মানুষের কাছে সব গোপনীয়তা প্রকাশ না করার জন্য ।
কিন্তু এসব অভিযোগ, সতকর্ীকরন মনসুরকে আটকাতে পারেনি ।
তিনি আবারো বলেন:
‘ আমার অস্তিত্বে তুমি মিশে গেছো যেমন সুরার সাথেজল। যা তোমাকে স্পর্শকরে আমি তার স্পর্শপাই’
এবার শরীয়তি আইনে তাকে খারিজী ঘোষনা করা হয় এবং বাগদাদে অবাঞ্চিত করা হয় ।
মনসুর আল-হেল্লাজ ফিরে যান তার জন্মস্থান ইরানে । সমগ্র ইরান জুড়ে তিনি ছোটে বেড়ান সাধারন মানুষ কে ইসলামের প্রেমময়তা শিক্ষা দেবার জন্য এবং সবখানেই তিনি সাধারন মানুষের ভালোবাসা পান আর শাসক গোষ্ঠী ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠা ন গুলোর বিরাগভাজন হন।
এর পর তিনি তার 400 শিষ্য নিয়ে মকক্বা শরীফে যান হজ্ব করার জন্য । সেখানে তাকে যাদুকর ও ভন্ড বলে তিরস্কার করা হয় এবং মকক্বা ন গরীর প্রবেশ দ্্বার বন্ধ করে দেয়া হয় ।
ফিরে এসে মনসুর একা বেরিয়ে পড়েন ছোট্র নৌকা নিয়ে । সাগর পাড়ি দিয়ে আসেন ভারতে । গুজরাট, সিন্ধু হয়ে চলে যান চীন দেশে । সবখানেই তিনি তার স্বভাব অনুযায়ী হাজার হাজার সাধারন মানুষের সাথে মিশেন,কথা বলেন,ধর্মের অপার সৌন্দর্য্য ব্যখ্যা করেন এবং সবখানেই তিনি ব্যাপকভাবে আদৃত হন।
মনসুর আবার ফিরে আসেন বাগদাদে । আবারো বাগদাদের সাধারন মানুষের সাথে শুরু হয় তার ভাবনা বিনিময় ।
তিনি সবাইকে বলেন:
‘যদি নিজেকে বিযুক্ত করা যায় সবকিছু থেকে তাহলে পৌঁছে যাওয়া যায় সেই অলৌকিকতায় যেখানে কিছুই বিযুক্ত নয় আর, কিছুই নয় সম্পৃক্ত’
এক পর্যায়ে মনসুর উচ্চারন করেন তার সবথেকে ভয়ংকর অথচ সুন্দর শব্দগুচ্ছ —
‘ আনাল হক’ ।
‘আমিই সত্য’ ।
তার এই উচ্চারনে কেঁপে উঠে বাগদাদ তথা সমস্ত মুসলিম বিশ্ব। বলা হয় মনসুর নিজেকে আল্লাহ ঘোষনা করেছেন যেহেতু ‘ হক’ আল্লাহর 99 নামের একটা । মনসুরকে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দেন ‘ আল্লাহ সবখানে এবং সবকিছুতেই । আল্লাহ আমার মাঝে ও । তাই আমি ই সত্য’
কিন্তু প্রথা গত ধর্মব্যবসথা তার ব্যখ্যায় খুশি হয়নি । এবার শরীয়া আইনে তাকে কাফের ঘোষনা করে বন্দী করা হয় ।
বন্দী হবার প্রথম দিন মনসুর জেলখানা থেকে অদৃশ্য হয়ে যান, দ্্বিতীয় দিন তাকে স হ পুরো জেলখানাই অদৃশ্য হয়ে যায়, তৃতীয় দিন আবার দৃশ্যমান হন তিনি এবং জেলখানা । এ ঘটনায় সমস্ত বাগদাদ জুড়ে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। প্রধান ধমর্ীয় পুরুষ গন ছুটে যান তার কাছে ।
তিনি ঘটনার ব্যখ্যা দেন এভাবে:
‘প্রথম দিন আমি চলে গিয়েছিলাম মহানবী(র:) কাছে, দ্্বিতীয় দিন মহানবী(র:) এসেছিলেন আমাকে দেখতে, তৃতীয় দিন আমি ফিরে এসেছি তার নির্দেশে শরীয়তকে সম্মান জানাতে’
ঐ জেলে সে সময় তিনশো বন্দি ছিলো । মনসুর তাদের বলেন ‘ তোমরা কি মুক্তি চাও?’ তারা পালটা প্রশ্ন করে ‘ওহে মনসুর ক্ষমতা থাকলে তুমি নিজেই মুক্ত হওনা কেন?’ তিনি জবাব না দিয়ে তাদের শিকলগুলোর দিকে চোখ মেলে তাকান । শিকল সব ভেং গে পড়ে । তিনি জেলখানার প্রধান ফটকের দিকে দৃষ্টি দেন । ফটক খুলে যায় । সব বন্দি বেরিয়ে যায় ।
পরদিন সকালে বিস্মিত ন গর বাসী একা মনসুরকে বসে থাকতে দেখে জেলখানায় । তাদের প্রশ্নের উত্তরে এবার তিনি বলেন ” আমি আমার প্রভূর দেয়া শাস্তির অপেক্ষা করছি’
বন্দি মুক্তির ঘটনা শোনার সাথে সাথে আব্বাসীয় খলিফা তাকে 300 দোররা এব ং ফাঁসীর নির্দেশ দেন ।
শরীয়া আইন অনুযায় ী বাগদাদের তৎকালীন কাজি খলিফার এই নির্দেশনামায় স্বাক্ষর করেন । পরিহাস এই, সে সময় বাগদাদের কাজী ছিলেন মনসুরেরই আধ্যাতি্নক শিক্ষক হযরত জোনায়েদ । হযরত জোনায়েদ নির্দেশ নামায় স্বাক্ষর দিয়ে বলেন ‘ইসলামী আইন অনুযায়ী সে দোষী কিন্তু আসল সত্য তো এক আল্লাহই জানেন’
মনসুর কে জনসম্মুখে 300 দোররা মারা হয় ।
মনসুর অবিচল,ভাবেলশহীন । হাজার হাজার সাধারন মানুষ বিস্ময় ভূলে চিৎকার দিয়ে উঠে ‘আনাল হক’ আনাল হক’
রক্তাক্ত মনসুরকে একজন প্রশ্ন করে ‘ ও মনসুর ইশক কি?’ মনসুর বলেন ‘ তোমরা ইশক দেখবে আগামী কাল ও তার পরদিন ‘
হাজর হাজার জনতার চিৎকারের মধ্য দিয়ে মনসুর কে নিয়ে যাওয়া হয় ফাঁসীর মঞ্চে ।
না মনসুরের মরদেহ কবর দেয়া হয়নি । শরীয়া আইনে ঘোষিত কাফের মনসুরের দেহ পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং ছাই ভাসিয়ে দেয়া হয় টাইগ্রীস নদীতে পরদিন ।
মনসুরের ছাই ভাসানোর সাথে সাথে ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে টাইগ্রীসের পানি । বাগদাদের সবাই ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে ‘ এ বোঝি তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ’
পরদিন যখন টাইগ্রীসের পানি প্রায় ঢুকে পড়ছে শ হরের ভেতরে তখনই মনসুরের এ কজন শিষ্য মনসুরের ব্যবহৃত চামড়ার থলেটি ছুঁড়ে ফেলেন সেই পানিতে এবং সবাইকে আবারো বিস্মিত করে পানি ফিরে যায় টাইগ্রীসে ।
পরে সেই শিষ্য অন্যদের বলেন যে মনসুর তার মৃতু্যর আগেই এই থলেটি তার কাছে রেখে এরকম নির্দেশ দিয়েছিলেন ।
ইসলামিক রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের ইসলামিক আইন দৈহিকভাবে মনসুরকে হত্যা করলে ও 1000 বছর থেক মনসুর হেল্লাজ প্রেরনার উৎস হয়ে আছেন মরমী সূফি, স হজিয়া বাউল ও সাধারন মানুষের কাছে ।

শান-এ-গাউসূল আজম মাইজভাণ্ডারী

বাবা ভান্ডারী ডটকম ::উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান আধ্যাত্ম মিলন কেন্দ্র মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ-এর পরিচিতি বর্তমানে স্বদেশের গন্ডি ছাড়িয়ে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের অনুসন্ধিৎসু সূফীবাদী পণ্ডিত ও গবেষকদের আগ্রহকে আকর্ষণে সমর্থ হয়েছে। দেড় শতাধিক বছরের ধারাবাহিকতায় সূচনা সময় থেকেই প্রতিকূলতা ও বিরোধিতাকে মোকাবেলা করে মাইজভাণ্ডারী তরিকার অনুসারীদেরকে পথ চলতে হয়েছে। মাইজভাণ্ডারী তরিকা ও দর্শনের বিকাশ ধারায় বিভিন্ন ইস্যুতে চিহ্নিত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধবাদী এবং স্বার্থান্বেষীদের প্রতিকূলতা ও বৈরীতা প্রতিরোধে বর্তমান সময়ে সমন্বিত প্রয়াস এবং উদ্যোগ গ্রহণের আবশ্যকতায় কোন ধরনের ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণের অবকাশ নেই। মাইজভাণ্ডারী তরিকা ও দর্শনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন ধরনের কর্মতৎপরতায় জড়িত কোন কোন ব্যক্তি ‘মাইজভাণ্ডারী’ পরিচয় ব্যবহার পূর্বক অবাঞ্চিত ও অননুমোদিত আচার ও আচরণে লিপ্ত থেকে মাইজভাণ্ডারী তরিকা ও দর্শন বিষয়ে অনাহূত বিতর্কের সৃষ্টি করে থাকে। ফলে মাইজভাণ্ডারী তরিকা ও দর্শনের মৌলিক রূপ-এর পরিবর্তে এই ক্ষেত্রে মাইজভাণ্ডারী তরিকত পন্থীদের ব্যাপারে ভুল ধারণার অনেক ক্ষেত্রেই এক ধরনের বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়ে থাকে। এই ধরনের কপটাচারীদেরকে প্রতিরোধ পূর্বক প্রকৃত মাইজভাণ্ডারী দর্শনের পরিচিতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে সমন্বিত ও সম্মিলিত উদ্যোগ একান্তভাবে জরুরি। বস্তুতঃ মাইজভাণ্ডারী তরিকত পন্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়, সম্পূরক ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক রচনার মাধ্যমে মাইজভাণ্ডারী তরিকা ও দর্শনের সুষ্ঠু বিকাশ ধারায় সংশ্লিষ্ট আওলাদবৃন্দের দায়িত্ব ও কর্তব্য সমূহ অধিকতর সচেতনতায় সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সুসম্পন্নের লক্ষ্যে একটি ঐক্যমঞ্চ প্রতিষ্ঠার আবশ্যকতা দীর্ঘ সময় ধরে অনুভূতত হয়ে এসেছে। মাইজভাণ্ডারী বেলায়তের অনুগ্রহে লালিত আওলাদে মাইজভাণ্ডারী ও খোলাফায়ে গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর আওলাদদের সমন্বয়ে সীমিত গণ্ডি ভেঙে সর্বজনীন অংশগ্রহণে সম্পূর্ণ গোষ্ঠী চেতনামুক্ত ও অরাজনৈতিক ঐক্যমঞ্চ হিসেবে নির্ধারিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ‘শান-এ-গাউসূল আজম মাইজভাণ্ডারী’ শীর্ষক এই ফোরাম ১৪২৮ হিজরীতে গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীর চান্দ্রবার্ষিকী ওফাত দিবস ২৭ জিলক্বদ মোতাবেক ৯ ডিসেম্বর ২০০৭ তারিখে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে আয়োজিত আওলাদে খেলাফায়ে গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী সম্মেলনে সাংগঠনিক ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই ফোরামের নামকরণ বিশ্লেষণ করলে সহজেই বুঝা যাবে যে উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান আধ্যাত্ম মিলনকেন্দ্র হিসেবে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ ও মাইজভাণ্ডারী শরাফতের মহান প্রতিষ্ঠাতাসহ মাইজভাণ্ডারী শরাফতের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল আধ্যাত্ম ব্যক্তিত্বদেরকে আবর্তিত করে বিগত দেড়শতাধিক বছরের ধারাবাহিকতায় যে অনন্য আধ্যাত্ম শরাফত প্রবহমান রয়েছে মাইজভাণ্ডারী তরিকা ও দর্শনের সেই ধারায় সঞ্জীবিত মাইজভাণ্ডারী আওলাদ ও খোলাফায়ে মাইজভাণ্ডারীর আওলাদ বা উত্তরাধিকারীদের দায় ও দায়িত্ব সমূহ সম্পূরক ও সমন্বিতভাবে সুসম্পন্ন করার প্রয়াসে শান-এ-গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী ফোরাম প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে চলেছে।

নিম্নে উল্লিখিত লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যে শান-এ-গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী ফোরাম-এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে চলেছে। (১) ইসলামের মৌলিক আহ্বান বিকাশের যুগোপযোগিতায় হযরত গাউসুল আযম শাহসূফী মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (১৮২৬-১৯০৬) (ক.) প্রবর্তিত এবং প্রদর্শিত মাইজভাণ্ডারী তরিকার মূল নীতিমালার যথাযথ অনুসরণ ও অনুশীলনে উদ্বুদ্ধ করা। (২) মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে আধ্যাত্ন শরাফতের প্রতিষ্ঠাতা ও মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রবর্তক শাহসূফী মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) এর গাউসূল আযমিয়তের শানসহ গাউসুল আযম বিল বেরাছত হযরত শাহসূফী মাওলানা সৈয়দ গোলাম রহমমান (ক.) সহ সমস্ত খোলাফায়ে গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর মর্তবা এবং মর্যাদা সুরক্ষায় সচেষ্ট থাকা। (৩) মাইজভাণ্ডারী তরিকার মূলদর্শন নীতিমালা ও এই মহান দরবারে পাকের শরাফত সম্পর্কে কোন কোন ক্ষেত্রে জনমনে যে বিরূপ ধারণা তৈরি হয়ে থাকে তা বিদূরিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণপূর্বক মাইজভাণ্ডারী তরিকার সুমহান মর্যাদা সমুন্নত রাখতে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা। (৪) বিভিন্ন অনুষ্ঠান, কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাইজভাণ্ডারী আধ্যাত্ম শরাফতের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল দরবারের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব ও সমন্বয় সৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা। (৫) জনকল্যাণে সামগ্রিক মাইজভাণ্ডারী তরিকা ও শরাফতের ধারায় প্রতিষ্ঠিত দরবার এবং সমস্ত আশেক ভক্তগণের অধিকতর সম্পৃক্তি নিশ্চিতকরণে উদ্যোগ গ্রহণ করা। (৬) ইসলামের মূল ধারাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তাসাউফের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা কেন্দ্র, পাঠাগারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত, কর্মঠ জনশক্তিতে রূপান্তরে সহায়তা করা। (৭) তরিকত চর্চার ক্ষেত্রে দরবার সমূহের কল্যাণকামী কর্মতৎপরতায় সহযোগিতা এবং অভিযোগ সমূহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট উত্থাপনপূর্বক প্রতিকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থায় সহায়তা করা। জাগতিকভাবে কলিকাতা আলীয়া মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী বাগ্মী আলেমে দ্বীন এবং বেলায়তের চর্চার ক্ষেত্রে যুগপ্রবর্তক হিসেবে রসুলে পাক (দ.) এর বেলায়তে মোতলাকা-এ আহমদির তাজধারী গাউসূল আজম মাওলানা শাহসূফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) বাংলার জমিনে দেশীয় সমাজ ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে ‘মাইজভাণ্ডারী তরিকা’ প্রতিষ্ঠা পূর্বক এক অনন্য কৃতিত্বে আমাদেরকে গর্বিত ও ঋদ্ধ করেছেন। ইসলামি হুকুমতের ছত্রছায়ায় পরিচালিত তরিকত পন্থা বেলায়তে মোকাইয়্যেদ যুগের ধারাবাহিকতা পাক-ভারত উপমহাদেশে অমুসলিম বিদেশি বৃটিশ শাসকদের প্রতিরুদ্ধতায় যখন স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছিলো সেই জরুরি মুহূর্তে গাউসূল আযম মাইজভাণ্ডারী বেলায়তে মোতলাকা যুগের সূচনা করে যুগচাহিদার আলোকে তরিকত চর্চায় আগ্রহী জনগোষ্ঠীর জন্য সর্বজনীন সংশ্লিষ্টতায় সমৃদ্ধ যে তরিকত পন্থার সূচনা করেছিলেন মূলত সেই ধারাকেই ধারণ করে মাইজভাণ্ডারী তরিকা ও দর্শন এর উদ্ভব হয়েছে। মাইজভাণ্ডারী শরাফতের ভিত্তিতে নবতর উদ্দীপনায় এতদাঞ্চলের তৎকালীন খ্যাতিমান আলেম ওলামা, ঐশী আলোর সন্ধানী ব্যক্তিত্ববৃন্দ সোহবত (সাহচর্য) ও নিসবত (নৈকট্য) হাসিলের মাধ্যমে খোলাফায়ে গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী হিসেবে পরিচিতি প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হয়েছিলেন। মাইজভাণ্ডারী তরিকা ও দর্শনের সম্প্রসারণে বদরযুদ্ধের বীরসাহসী মোজাহেদ, শহীদ ও গাজী সেনানীর মত তাঁদের ভূমিকা নিঃসন্দেহে শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে স্মরণীয় হয়ে এতদাঞ্চলে তরিকত চর্চার ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকবে। যেহেতু এসকল ওলীর প্রেমাভিযানের ফলে, লক্ষ লক্ষ পথহারা মানুষ খোদাপথের সন্ধান লাভে ধন্য হয়েছে। মাইজভাণ্ডারী দর্শনে ধর্মীয় চেতনায় এক অনিবার্য বিপ্লব, চলমান সকল তরিকত পন্থীদের সমান্তরালে এক অনন্য আধ্যাত্ম চেতনা। জাতিধর্মবর্ণগোত্র নির্বিশেষে সকলের বিশ্বাসবোধকে বেষ্টনকারী, প্রাগ্রসর বিশ্বমানবতার কল্যাণে এক অপরিহার্য আন্দোলন, ইহকাল ও পরকালের মুক্তিসনদ পৌত্তলিকতাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা নাস্তিক্যবাদ ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধবাদী, ধর্মসাম্যের সর্বজনীন আবেদন সমৃদ্ধ মানবতাকামীদের জন্য পরম কাঙিক্ষত মহান তত্ত্ব। ‘শরীয়ত তরিকত হাকিকত ও মায়ারেফাতের প্রভাবে ও সংমিশ্রণে মাইজভাণ্ডারী তরিকা রূপ মহাসাগরে উৎপত্তি’। ইসলামি সূফীবাদের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের মাটিতে উদ্ভূত একমাত্র তরিকা হিসেবে মাইজভাণ্ডারী তরিকা আধুনিক বিজ্ঞান ও কুরআন সুন্নাহ সম্মত তরিকা হিসেবে ইতিমধ্যে বিশ্ব সূফীবাদী গবেষক, পণ্ডিতসহ সর্বত্র স্বীকৃতি লাভ করেছে। আদলে মোতলাক বা বিচার সাম্যের প্রতিষ্ঠায় এতদাঞ্চলের জনমানসে রহমতুল্লিল আলামীন এর সর্বজনীন আহ্বান বাস্তবায়নে কোরআনী হেদায়ায়তের আলোকে মাইজভাণ্ডারী তরিকা ও দর্শন অমিত এক সম্ভাবনাকে ধারণ করে রেখেছে সযতনে। এই বাস্তব সমগ্র মানবগোষ্ঠীর গোচরে আনার মহান দায়িত্ব নিতে হবে সকল মাইজভাণ্ডারী তরিকত পন্থীদেরকে। গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী মাওলানা শাহসূফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) {১৮২৬-১৯০৬}প্রবর্তিত ও গাউসুল আজম বিলবেরাছত বাবাভাণ্ডারী মাওলানা শাহসূফী সৈয়দ গোলাম রহমান (ক.) {১৮৬৫-১৯৩৭}-এর কামালিয়তে লালিত মাইজভাণ্ডারী তরিকা ও দর্শনের অনুসারীদের সমন্বয়ে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক প্লাটফর্ম হিসেবে সকল মাইজভাণ্ডারী তরিকতপন্থীদের সম্মিলনী ঐক্যমঞ্চ হিসেবে শান-এ-গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী ফোরাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যকে ধারণ করেই এই ঐক্যমঞ্চ প্রতিষ্ঠা সময় থেকেই কার্যক্রম পরিচালনা করে চলেছে এবং ভবিষ্যতে এই ধারা আরো শক্তিশালী স্রোতধারা হিসেবে মানব কল্যাণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালনে সমর্থ হবে ইনশাআল্লাহ। প্রাথমিকভাবে শান-এ গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী ফোরামের তত্ত্বাবধানে-
(১) মাইজভাণ্ডারী তরিকত পন্থীদের তত্ত্বাবধানে প্রকৃত তাসাউফপন্থী আলেমেদ্বীন তৈরিতে সহায়তার লক্ষ্যে একটি উচ্চতর মর্যাদা সম্পন্ন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার একটি উদ্যোগ ইতিমধ্যে ফোরামের পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। (২) মাইজভাণ্ডারী শান ও আধ্যাত্ম শরাফত প্রসঙ্গে স্বার্থান্বেষীদের অপতৎপরতা সমূহ প্রতিরোধ প্রয়াসে বিভিন্ন ক্ষেত্রে লেখনী ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। (৩) মাইজভাণ্ডারী তারকা ও দর্শনে আস্থাশীল আলেম-ওলামাদের সমন্বয়ে ফোরামের তত্ত্বাবধানে ‘গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী ওলামা পরিষদ’ শীর্ষক একটি স্বতন্ত্র বিভাগীয় ইউনিট ইতিমধ্যে গঠন করা হয়েছে। (৪) দেশব্যাপী মাইজভাণ্ডারী দরবার সমূহে ফোরাম এর ‘দরবার ইউনিট কমিটি’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শান-এ গাউসুলআযম মাইজভাণ্ডারী ফোরামের সাংগঠনিক ভিত্তি দৃঢ়তর করার প্রয়াসও অব্যহত রয়েছে। ৩০ অক্টোবর ২০১০ তারিখে চট্টগ্রামে লালদীঘির ময়দানে বৃহত্তর আঙ্গিকে ‘মাইজভাণ্ডারী সম্মেলন’ আয়োজনের আসন্ন উদ্যোগেও ফোরামের সমন্বিত কর্মতৎরতায় সাফল্যের ফলশ্রুতি নিঃসন্দেহে।
আগামীতে আরো অধিক কার্যকর ও উজ্জ্বল কর্মতৎপরতা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শান-এ-গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী তার সাংগঠনিক সামর্থকে যথাযথভাবে উপস্থাপনে সমর্থ হবে ইনশাআল্লাহ। কাঙিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে ফোরামের সাংগঠনিক ভিত্তি সুসংহত করতে এই আধ্যাত্ম শরাফতের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য।
কৃতজ্ঞতা : প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আবদুস মান্নান চৌধুরী কৃত ‘কাওকাবুদদুররী’।

গাউসুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ আল্ মাইজভাণ্ডারী (ক.) ও তাঁর তরিকা

তরিকায়ে মাইজভাণ্ডারী’ আখেরি জামানার খোদাপ্রেমের সর্বশ্রেষ্ঠ তরিকা, যা বাংলাদেশের মাটি থেকে উদ্ভূত হয়েছে। ফলে ওই তরিকায় ইসলামী সংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির এক অভূতপূর্ব মিল পরিলক্ষিত হয়। এই মহান তরিকার প্রবর্তক গাউসুল আজম হজরত মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ আল মাইজভাণ্ডারী এবং প্রতিষ্ঠাতা গাউসুল আজম হজরত মাওলানা সৈয়দ গোলামুর রহমান আল-মাইজভাণ্ডারী (ক.)। আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে দুনিয়ার মোহান্ধ মানুষকে কল্যাণ ও মুক্তির পথ প্রদর্শনের জন্য নবী, রাসুল, গাউস-কুতুব ও অলি-দরবেশদের হাদি বা পথপ্রদর্শক হিসেবে পাঠিয়ে থাকেন। নবী-রাসুল আসা বন্ধ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কিয়ামত পর্যন্ত পথভ্রষ্ট মানুষকে সত্যের পথে হিদায়াত করতে গাউস-কুতুব, অলি আল্লাহদের আবির্ভাব জারি থাকবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করছেন_’ওয়া মিম্মান খালাক্না উন্মাতু ইঁয়াহদূনা বিল হাক্কি।’ অর্থাৎ, আমার সৃষ্টির মধ্যে এমন একটি সম্প্রদায় আসবে, যাঁরা পথভ্রষ্ট মানুষকে হিদায়াত করবে। (সুরা আল-আ’রাফ, আয়াত_১৮)। পবিত্র কোরআনে তিনি আরো ঘোষণা করেন_’লি কুলি্ল জা’আল্না মিন্কুম সিরাতাওঁ ওয়া মিন্হাজান’ অর্থাৎ, আমি (আল্লাহ) তোমাদের জন্য একটি সাধারণ পথ (শরিয়ত) এবং অপরটি মিনহাজ (অর্থাৎ, বিশেষ পথ তথা তরিকত) সৃষ্টি করেছি। (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত_৪৮)
মাইজভাণ্ডারী তরিকা হচ্ছে প্রেমনির্ভর তরিকা। তাই এখানে আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে প্রেমের উচ্ছ্বাসই বেশি পরিলক্ষিত হয়। এই তরিকার অনুসারীরা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে ভালোবাসতে শেখে। তাই তারা মূলত অসাম্প্রদায়িক। মাইজভাণ্ডারী তরিকায় আনুষ্ঠানিক ইবাদতের প্রভাব কম দেখায় অনেকেই ওই তরিকার দুই প্রধান পুরুষ হজরত আকদাস (ক.) এবং হজরত বাবা ভাণ্ডারীকে (ক.) সত্যিকারের অলি হিসেবে মানলেও তরিকায়ে মাইজভাণ্ডারীকে মানতে কেমন যেন উসখুস ভাব প্রকাশ করেন। এ রকম ধারণা ইলমে তাসাউফ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানের অভাবেই করে থাকেন। প্রেম-বিহ্বল চিত্ত এবং ‘তাসাউর-এ শেখ’ (বা আপন পীর-মুর্শিদের ধ্যান)-কে ওই তরিকার প্রধান বৈশিষ্ট্য বলা যায়। এই দুটি দিককে আরো গতিময় করতে সেমা বা আধ্যাত্মিক সংগীত খোদাপ্রেমকে সহস্র গুণে গতিময় করে থাকে। প্রেমাকর্ষণ ও আধ্যাত্মিক সংগীতের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা অত্যন্ত যুগোপযোগী, আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত একটি অনন্য উপায় হিসেবে বিবেচিত। কারণ, আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত হিকমতের সঙ্গে মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করার নির্দেশ আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে দিয়েছেন। (সুরা আন-নাহ্ল, আয়াত_১২৫)। নবী-রাসুলরা তাই যুগোপযোগী শরিয়ত প্রবর্তন করেছেন। শরিয়তের বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হলেও উদ্দেশ্যের দিক দিয়ে সব ধর্ম ছিল এক এবং অভিন্ন। রাসুল (সা.)-এর জমানায়ও দেখা যায়, তিনি প্রয়োজনে শরিয়ত প্রবর্তন করেছেন, আবার প্রয়োজনে স্থগিতও করেছেন। যেমন_একদিন এক লোক এসে বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.), শরিয়তের বিধি-বিধান আমার কাছে অত্যন্ত বিরক্তিকর। সুতরাং আমাকে একটি সহজ উপায় বলে দিন।’ রাসুল (সা.) তাঁকে বললেন, ‘লা ইয়াজাল লিসানাকা রতবাম মিন জিক্রুল্লাহি।’ অর্থাৎ, তুমি সব সময় তোমার জিহ্বাকে আল্লাহর স্মরণে সিক্ত রাখবে। (ইবনে মাজাহ, মিশকাত)
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়, রাসুল (সা.) ওই লোকটিকে শরিয়তের নির্দেশ পালনে বাধ্য করেননি। যার ফিত্রাত বা স্বভাব যে রকম, তাকে সেভাবেই হিদায়াত করেছেন। এটাই হচ্ছে সুন্দরতম কৌশল এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়। রাসুল (সা.)-এর পর তাঁর পবিত্র বংশজ ইমাম ও গাউস মুজাদ্দিদরা তাঁর যোগ্য স্থলাভিষিক্ত এবং ওয়ারিসাতুল আম্বিয়া হিসেবে যুগোপযোগী বিধান প্রদানের অধিকারী। এ ব্যাপারে তাসাউফের মাশায়েখরা একমত। তাই মাইজভাণ্ডারী তরিকায় বিভিন্ন লোককে বিভিন্ন হিকমতের মাধ্যমে তাদের অন্তরে সুপ্ত খোদাপ্রেমকে জাগিয়ে তুলতে দেখা যায়। অন্তরে খোদাপ্রেম জাগিয়ে তুলতে পারলে সেই প্রেমের অনলে যাবতীয় নাফ্সানিয়াত জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যায়। মাইজভাণ্ডারী তরিকা বাংলার বুকে এটা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, এটা আধ্যাত্মিক সংগীত মোহান্ধ এবং অধঃপতিত মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বানের জন্য অত্যন্ত যুগোপযোগী ও বিজ্ঞানসম্মত একটি ব্যবস্থা। এ পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে লাখ লাখ মানুষ আল্লাহ এবং রাসুল (সা.)-এর প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে সত্যের সন্ধান ও খোদার দিদার লাভে সক্ষম হয়েছে।
মাইজভাণ্ডারী তরিকা পবিত্র ইসলাম ধর্মেরই একটি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক সংস্করণ। এই তরিকা মূলত প্রেমের তরিকা। সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা এবং জ্ঞাতি বিদ্বেষের ঊধর্ে্ব উঠে এই তরিকা মানুষকে স্রষ্টাপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। এই তরিকার মুরিদরা সাধারণত প্রেমিক ধাঁচের হয়ে থাকে এবং সব বৈষয়িক বিষয়বস্তু থেকে স্বীয় মুর্শিদকেই অধিকতর ভালোবেসে থাকে। বর্তমান সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপূর্ণ পৃথিবীতে ধর্মীয় ঐক্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় ওই তরিকা এক অনন্য ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।

হযরত ইয়াকুব (আঃ)

হযরত ইয়াকুব (আঃ) ইংরেজি ভাষায়: Jacob; হিব্রু ভাষায়: יַעֲקֹב‎ ; আধুনিক: Yaʿakov; সেপ্তুয়াগিন্ত গ্রিক ভাষায়: Ἰακώβ Iakōb; আরবি ভাষায়: يَعْقُوب), ইসরাঈল নামেও পরিচিত (হিব্রু ভাষায়: יִשְׂרָאֵל; আধুনিক: Yiśrāʾēl; সেপ্তুয়াগিন্ত গ্রিক ভাষায়: Ἰσραήλ Israēl; আরবি ভাষায়: إِسْرَائِيل), হিব্রু বাইবেল এবং কোরআনের বর্ণনা অনুসারে, তিনি ছিলেন একজন নবী। তার গোত্রের নাম ছিল বানী-ইসরাঈল। এই নামে কোরআনে একটি সূরা নাযিল হয়েছে।

জীবনী

পারিবারিক জীবন

ইয়াকুব (আঃ) এর বার জন পুত্র-সন্তানের কথা কোরাআনে উল্লেখ করা হয়েছে এবং হিব্রু বাইবেলে বার জন পুত্র-সন্তান ও কয়েক জন কন্যা সন্তানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মেয়েদের মধ্যে শুধু একজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকেরই সন্তান-সম্ভতি হয় এবং বংশ বিস্তার লাভ করে। হিব্রু বাইবেল অনুসারে তাদের নাম হলঃ রেউবেন, সিমোন, লেভি, জুদাহ, দান, নাফতালি, গাদ, আশের, ইসসাচার, জেবুলুন, মেয়ে দিনাহ, জোসেফ বা ইউসুফ, এবং বেনজামিন বা বেনিয়ামিন। তার উপাদি ছিল ইসরাঈল । তাই বারটি পরিবার সবাই বনী-ইসরাঈল নামে খ্যাত হয়। বারপুত্রের মধ্যে দশ জন জ্যেষ্ঠপুত্র ইয়াকুব (আঃ) এর প্রথমা স্ত্রী "লাইয়্যা বিন্‌তে লাইয়্যানের" গর্ভে জন্মলাভ করে। তাঁর মৃত্যুর পর ইয়াকুব (আঃ) লাইয়্যার ভগিনী "রাহীলকে" বিবাহ করেন। রাহীলের গর্ভে দু'পুত্র ইউসুফ ও বেনিয়ামিন জন্মগ্রহণ করেন। তাই ইউসুফ (আঃ) এর একমাত্র সহোদর ভাই ছিলেন বেনিয়ামিন এবং অবশিষ্ট দশ জন বৈমাত্রেয় ভাই ও কয়েক জন বোন। ইউসুফ জননী রাহীলও বেনিয়ামিনের জন্মের পর মৃত্যুমুখে পতিত হন।[১]

ইউনুস

ইউনুস (আ:) (হিব্রু ভাষায়: יוֹנָה, আধুনিক হিব্রু: Yona, তিবেরিয়ান: jon'ɔh, "dove"; আরবি:يونس, ইউনুস আথবা يونان, ইউনান; লাতিন: Ionas) কুরআনের বর্ণনা অনুসারে, তিনি ছিলেন একজন নবী। যাকে 'নীনাওয়া' বাসীদেরকে হিদায়াতের জন্য আল্লাহ প্রেরণ করেন।

কোরআনে ইউনুস (আ:)এর আলোচনা

কোরআনে ছয়টি সূরায় মোট ১৮ বার ইউনুস (আ:)এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সূরাগুলো হলো- আনআ'ম, ইউনুস, আস ছাফ্‌ফাত, আল আম্বিয়া, এবং আল ক্বলম। এর মাঝে প্রথম চারটি সূরায় তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। শেষের দু'টি সূরায় তাঁর গুণপ্রকাশক শব্দ 'যুন্নুন' (আরবি: ذو النون) এবং 'সাহিবুল হূত' (আরবি: صاحب الحوت) উল্লেখ করা হয়েছে। আর সূরা-নিসা ও সূরা-আনআ‍‌'মে পয়গম্বরদের তালিকার মাঝে শুধু তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে; অন্য কোন আলোচনা করা হয়নি। এছাড়া বাকী চারটি সূরায় তাঁর ঘটনার ওপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে। নিচে এ সম্পর্কিত একটি ছক দেয়া হলো:[১]
ক্রমিক সংখ্যা সূরা আয়াত নং উল্লেখের সংখ্যা
আন নিসা ১৬৩
আল আনআম ৮৭
ইউনুস ৯৮
আল আম্বিয়া ৮৭,৮৮
আস ছাফ্‌ফাত ১৩৯-১৪৮ ১০
আল ক্বলম ৪৮-৫০
কোরআনে ইউনূস (আ:)এর ঘটনা উল্লেখ করে সূরা আস-ছাফফাতেবলা হয়েছে:
আর ইউনুসও ছিলেন পয়গম্বরগণের একজন। যখন পালিয়ে তিনি বোঝাই নৌকায় গিয়ে পৌঁছেছিলেন। অতঃপর লটারী (সুরতি) করালে তিনি দোষী সাব্যস্ত হলেন। অতঃপর একটি মাছ তাঁকে গিলে ফেলল, তখন তিনি অপরাধী গণ্য হয়েছিলেন। যদি তিনি আল্লাহর তসবীহ পাঠ না করতেন, তবে তাঁকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত মাছের পেটেই থাকতে হত। অতঃপর আমি তাঁকে এক বিস্তীর্ণ-বিজন প্রান্তরে নিক্ষেপ করলাম, তখন তিনি ছিলেন রুগ্ন। আমি তাঁর উপর এক লতাবিশিষ্ট বৃক্ষ উদগত করলাম। এবং তাঁকে, লক্ষ বা ততোধিক লোকের প্রতি প্রেরণ করলাম। তারা বিশ্বাস স্থাপন করল অতঃপর আমি তাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত জীবনোপভোগ করতে দিলাম।[২]

নাম ও বংশপরিচয়

ইউনূস (আ:)এর বংশ সম্পর্কে শুধু এটুকুই জানা যায় যে, তাঁর পিতার নাম ছিল 'মাত্তা'।বুখারী শরীফের একটি হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস হতে এ কথা স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। বাইবেলে ইউনূস (আ:)এর নাম 'ইউনাহ' এবং তাঁর পিতার নাম 'আমতা' বলা হয়েছে। তবে ইউনূস ইবনে মাত্তাহ এবং ইউনাহ ইবনে আমতার মাঝে ব্যক্তি হিসেবে কোন পার্থক্য নেই। এটা আরবি ও হিব্রু ভাষার উচ্চারণের পার্থক্য।[৩]

ধর্মপ্রচারের স্থান

ইরাকের সুপ্রসিদ্ধ জনপদ 'নীনাওয়া'এর অধিবাসীদের হিদায়াতের জন্য তাঁর আবির্ভাব হয়েছিল। নীনাওয়া আশূরী রাজ্যের রাজধানী এবং মাওসেল এলাকার কেন্দ্রীয় শহর ছিল। কোরআনে এই শহরের জনসংখ্যা এক লক্ষাধিক বলা হয়েছে।[৪]

ইউনূস (আ:)এর ঘটনা

২৮ বছর বয়সে ইউনূস (আ:) নুবূয়্যত লাভ করেন এবং নীনাওয়াবাসী দাওয়াত দিতে আদিষ্ট হন। দীর্ঘদিন দাওয়াত দেয়ার পরও তারা ইমান না আনায় তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে নীনাওয়াবাসীর জন্য গজবের দোয়া করেন এবং ওই শহর ত্যাগ করেন।ফোরাত (ইউফ্রেটিস)নদীর তীরে পৌঁছার পর তিনি নৌকায় আরোহণ করেন। মাঝনদীতে যাওয়ার পর নৌকা ঝড়ে আক্রান্ত হয়। সে যুগের কুসংস্কার অনুযায়ী নৌকার আরোহীরা মনে করলো, নিশ্চয় এই নৌকায় কোন পলাতক দাস আছে। এটা শুনে ইউনূস (আ:)এর চৈতন্যদয় হলো যে, তিনি শহর ছাড়ার ব্যাপারে আল্লাহর অনুমতির অপেক্ষা করেননি। তিনি নিজের দোষ স্বীকার করলেন। কিন্তু নৌকার আরোহীরা তাঁর সততায় মুগ্ধ হলো এবং তাকে নৌকা থেকে ফেলে দিতে সম্মত হলো না। শেষপর্যন্ত তারা লটারী করলো এবং সেখানেও ইউনূস (আ:)এর নামই উঠলো। ফলে বাধ্য হয়ে তারা ইউনুস (আ:)কে নদীতে ফেলে দিল।এ সময় এক বিরাট মাছ তাকে গিলে ফেলে। কারো কারো মতে, সেটা ছিল তিমি মাছ। তিমির পেটের অন্ধকারের মাঝে তিনি আল্লাহর কাছে কাকুতি মিনতি করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ফলে আল্লাহর আদেশে মাছটি তাকেঁ তীরে এসে উগড়ে দিল। কোরআনরে বর্ণনামতে, দীর্ঘদিন মাছের পেটে থাকার কারণে তিনি অসুস্থ এবং দুর্বল হয়ে পড়েন। তাই আল্লাহ আপন অনুগ্রহে সেখানে লাউগাছ উৎপন্ন করেন। সুস্থ হওয়ার পর তাকেঁ আবার নীনাওয়াবাসীদের কাছেই পাঠানো হয় এবং নীনাওয়াবাসী ইমান আনে।[৫]

ইসলামের পয়গম্বর

ইসলামের পয়গম্বর ( আরবি ভাষায়: نبي) হলেন সেই সকল ব্যক্তিত্ব যাদেরকে মুসলিমগণ স্রষ্টা কর্তৃক মানুষের দিক নির্দেশনা প্রদানের জন্য মনোনীত হিসাবে বিবেচনা করে। ইসলামী পরিভাষায় একে বলা হয় নাবী (বহু আনবিয়া)।
ইসলামী ঐতিয্য মতে ঈশ্বর প্রত্যেক জাতির নিকট পয়গম্বরগণকে প্ররণ করেছেন। ইসলাম অনুযায়ী একমাত্র মুহাম্মদই ঈশ্বরের বার্তা সমগ্র মানবজাতির নিকট পৌছানোর জন্য প্ররিত হয়েছিলেন, যেখানে অন্যান্য পয়গম্বরগণ একটি নির্দিষ্ট গোত্র বা জাতির নিকট প্রেরিত হয়েছিলেন।
ইহুদি ও খ্রীষ্টধর্মের বিপরীতে, ইসলাম ঈশ্বরের বার্তবাহক এবং পয়গম্বরের মধ্যে পার্থক্য করে। উভয়ই “ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণা”র দ্বারা ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত। তদুপরি, বার্তাবাহকগণ গ্রন্থ আকারে একটি সম্প্রদায়ের জন্য ঐশ্বরিক বার্তা প্রদান করেন এবং পয়গম্বরগণের বিপরীতে ঈশ্বর কর্তৃক সাফল্যের নিশ্চয়তা প্রাপ্ত ব্যক্তি। যেমন: মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থ কুরআনে বলা হয়েছে,
যদিও সকল "রাসুল" গণই "নবী", কিন্তু সকল "নবী" গণ "রাসুল" নন। [১] [২] [৩] [৪]
সকল বার্তাবাহক এবং কজন পয়গম্বরের নাম কুরআনে উল্লেখিত আছে। মুসলিমগণ বিশ্বাস করে আদম হলেন প্রথম পয়গম্বর, পক্ষান্তরে শেষ পয়গম্বর হলেন মুহাম্মদ, তাই তাঁর উপাধি, নবীদের সিলমোহর। খ্রীষ্টধর্মের মতই ইসলামেও ঈসার (যেসাস) জন্ম কৌমারিকেয় জন্মের ফসল এবং তিনি নবী হিসাবে বিবেচিত হন কারণ ঈশ্বরের নিকট হতে তিনি ওহী প্রাপ্ত। যেসাস একজন বার্তাবাহক হিসেবেও বিবেচিত হন কারণ ঈশ্বর তাঁর নিকট সুসমাচার প্রকাশ করছিলেন।[৫] অবশ্য, খ্রীষ্টধর্মের বিপরীতে, ইসলাম ধর্মে, ঈশ্বরের পুত্র দাবি করা ধর্ম বিরোধী এবং যেসাস একজন মানুষ হিসাবেই বিবেচিত হন।

প্রথম মানব ও প্রথম রাসুল

সকল আব্রাহামীয় ধর্মের ঐশ্বিক গ্রন্থ মোতাবেক আদম ঈশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট প্রথম মানব। কোরানের বর্ননা থেকে জানা যায়, আল্লাহ যখন ফেরেশতাদেরকে জানালেন যে তিনি পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি নিয়োগ দিতে যাচ্ছেন তখন ফেরেশতারা বলল,
“আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে দাঙ্গা-হাঙ্গামার সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা নিয়ত আপনার গুণকীর্তন করছি এবং আপনার পবিত্র সত্তাকে স্মরণ করছি?” তখন আল্লাহ বলেন “নিঃসন্দেহে আমি জানি, যা তোমরা জান না।” [১]
আব্রাহামীয় ধর্মের বিভিন্ন গ্রন্থ অনুসারে ঈশ্বর তাঁকে খরখরে মাটি থেকে সৃষ্টি করেন। তারপর তাঁর দেহে প্রাণ সঞ্চার করা হয়। হাওয়াকে সৃষ্টি করা হয় আদমের পাঁজর থেকে। সৃষ্টির পর তাঁদের আবাস হয় (जन्नत) বেহেশত বা স্বর্গ। মানুষ যেহেতু সকল সৃষ্টির সেরা তাই ঈশ্বর দেবদূত বা ফেরেশতাকুলকে আদেশ করেন আদমকে সিজদা করার জন্য। ইবলিশ ব্যতীত সকল ফেরেশতা এই আদেশ প্রতিপালন করেন।
কুরআনে বলা হয়েছে,
“আমি আদমকে পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি নিযুক্ত করিব।” (সুরা বাক্বারাহ, আয়াত: ৩০)
কুরআনে আদম-এর নাম ২৫টি আয়াতে ২৫ বার উল্লেখ করা হয়েছে।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] সূরা বাক্বারাহ, সুরা আ-রাফ, সুরা ইসরা, সুরা কাহ্ফ এবং সুরা ত্ব-হাতে তাঁর নাম, গুনাবলী ও কার্যাবলী আলোচনা করা হয়েছে। সূরা হিজর ও ছোয়াদে শুধু গুণাবলী এবং সূরা আল ইমরান, সুরা মায়েদাহ এবং সুরা ইয়াছীনে আনুসঙ্গিক রুপে শুধু নামের উল্লেখ আছে।
আবূ হূরায়রা থেকে বর্ণিত যে, মুহাম্মদ বলেন, আল্লাহ আদমকে সৃষ্টিকালে তার উচ্চতা ছিল ৬০ কিউবিট। এবং মানুষ বেহেশতে প্রবেশকালে আদমের আকার লাভ করবে।[২]

আসমানী কিতাব

আসমানী কিতাব বা ঐশ্বিক গ্রন্থ বলতে এমন কতকগুলো গ্রন্থকে বোঝানো হচ্ছে, ইসলাম ধর্মমতে মুসলমানগণ যে গ্রন্থগুলোকে ঈশ্বরপ্রদত্ত গ্রন্থ বলে বিশ্বাস করেন। ইসলাম ধর্মে যে ৭টি বিষয়ের উপর বিশেষ করে ঈমান আনতে বা বিশ্বাস স্থাপন করতে বলা হয়েছে তার মাঝে একটি হলো এই যাবতীয় আসমানী কিতাব, যা সরাসরি ঈশ্বরের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছিলো। ইসলাম ধর্মমতে, পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে সর্বমোট আসমানী কিতাব পাঠানো হয়েছে ১০৪খানা। তার মধ্যে ৪খানা হলো প্রধান আসমানী কিতাব ও বাকি ১০০খানা সহীফা
প্রধান চারখানা আসমানী কিতাব হলো:
  • তৌরাত, যা অবতীর্ণ হয় ঈশ্বরের বাণীবাহক হযরত মুসা [আ.]-এর উপর,
  • যাবুর, যা অবতীর্ণ হয় ঈশ্বরের বাণীবাহক হযরত দাউদ [আ.]-এর উপর,
  • ইনযিল, যা অবতীর্ণ হয় ঈশ্বরের বাণীবাহক হযরত ঈসা [আ.]-এর উপর, এবং
  • আল‌‌-কোরআন সর্বশেষ এবং পরিপূর্ণ আসমানী কিতাব, যা অবতীর্ণ হয় ঈশ্বরের বাণীবাহক হযরত মুহাম্মদ [স.]-এর উপর।[১]
তন্মধ্যে ইহুদিখ্রিষ্ট ধর্মমতে, 'তৌরাত' বলতে ইঙ্গিত করা হয় 'তোরাহ'কে , 'যাবুর' বলতে ইঙ্গিত করা হয় 'যামস'কে, 'ইঞ্জিল' বলতে ইঙ্গিত করা হয় 'গসপেল'কে
এছাড়া অন্যান্য অপ্রধান ১০০খানা আসমানী কিতাব অবতীর্ণ হয় অপরাপর বিভিন্ন বাণীবাহকের উপর। যথা:
  • হযরত শীস [আ.]-এর উপর ৫০খানা সহীফা,
  • হযরত ইদ্রিস [আ.]-এর উপর ৩০খানা সহীফা, এবং
  • হযরত ইব্রাহীম [আ.]-এর উপর ২০খানা সহীফা।[১]

ইসলামের আবির্ভাবের জন্য আরবের বিশেষত্ব

বেশ কয়েকজন ঐতিহাসিকের মতে, তখনকার সময় একজন নবীর আগমন এবং তার সফলতা লাভের জন্য আরব দেশ যথেষ্ট উপযুক্ত স্থান ছিল। ইসলামী আন্দোলনের জন্যও তা একটি উর্বর ভূমি হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। এজন্যই সেখানে ইসলামের বিজয় সম্ভবপর হয়েছিল। তাদের মতামত অনুসারে ইসলামের ব্যাপক প্রসার সম্ভব হয়েছিল নিম্নে উল্লিখিত কারণে,
  • এটি সুস্পষ্ট যে, কোন মতাদর্শের বিজয়ের জন্য কোন একজন ব্যক্তির জীবনই যথেষ্ট নয় বরং প্রয়োজন একদল যোগ্য লোকের একটি বাহিনী তৈরি যারা সেই মতাদর্শের প্রচার ও প্রসার কাজ আজীন চালিয়ে যাবেন। আর এ ধরনের কাজ আঞ্জাম দেয়ার ক্ষমতা আরব উপদ্বীপের অধীবাসীদের মাঝে তখন পূর্ণ মাত্রায়ই বিরাজমান ছিল। কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে বিষয়টি তা হল আরব বিশ্বের মানব অধ্যুসিত এলাকার প্রায় কেন্দ্রে অবস্থিত ছিল এবং এর সাথে বহির্বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থা সবচেয়ে উন্নত ছিল। মোহাম্মদের (সাঃ) জন্মের আগেই আরব বণিকরা সারা বিশ্বে বাণিজ্য উপলক্ষে ঘুরে বেড়াতো। এজন্যই মূলত নবীর (সাঃ) হাতে ইসলামের বিজয় সাধিত হওয়া সম্ভবপর হয়েছিল।
  • আরেকটি গুরুত্ব ছিল আরবি ভাষার। বিশ্বের অন্য কোন ভাষী সেই সময়ে এতটা উৎকর্ষ লাভ করেনি যা চিরকাল অপরিবর্তিত রাখা সম্ভবপর। তদুপরি সেই সময়টা ছিল আরবি ভাষার চরম উৎকর্ষের কাল।
  • আরবরা কোন রাজত্বের অধীনে শৃঙ্খলিত ছিলনা। অন্য জাতির গোলামীর কারণে মানুষের মুক্তচিন্তা ও তদসংশ্লিষ্ট যে সকল গুণাবলীর অপমৃত্যু ঘটে তাও প্রশ্নাতীত। আরবের চারদিকে পারস্যরোমের মত দুইটি পরাশক্তির রাজত্ব বিস্তৃত থাকলেও কেউ তাদেরকে পরাজিত করতে পারেনি। এতেই আরবদের শৌর্য্য বীর্যের পরিচয় পাওয়া যায় যা ইসলামী আন্দোলনের আরেকটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত।
  • আরবদের স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। একটি কথা একবার শুনলেই তা মনে রাখার মত ক্ষমতা তাদের ছিল। এজন্যই ইসলামী শরীয়তের সকল উৎসের হুবুহু সংরক্ষণ সম্ভবপর ছিল যা কোন ধর্মের সার্বজনীনতা এবং সিদ্ধির জন্য একান্তই অপরিহার্য।
  • সর্বোপরি আরবরা ছিল দূর্ধর্ষ জাতি। মরুভূমির রুক্ষতা তাদেরকে পুরোমাত্রায় বাস্তববাদী করে তোলে। ফলে যে মতাদর্শে তারা বিশ্বাসী তা গ্রহণ করার পর উপাসনালয়ের এক কোণায় বসে বসে কেবল তার প্রশস্তিকীর্তণ করা তাদের পক্ষে ছিল অসম্ভব বরং সেই মতাদর্শের প্রতিষ্ঠার জন্য মাথা তুলে দাঁড়ানো এবং তাতে সর্বশক্তি ব্যয় করাই ছিল তাদের ধর্ম যা ইসলামের প্রতিষ্ঠার জন্যও অপরিহার্য ছিল।
এই মতামতের ভিত্তিতে ঐতিহাসিকগণ আরো মনে করেন যে,এত সম্ভাবনা সত্ত্বেও ইসলামের প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক বিরুদ্ধবাদিতার মুখোমুখি হতে হয়, কারণ বিরোধী আরবদেরও এই গুণগুলো ছিল এবং তারা মাধা নত করায় অভ্যস্ত ছিলনা। যেহেতু আরবে নেতাদের অত্যধিক সম্মান ছিল এজন্য কেউই চায়নি যে ইসলাম সফলতা পাক এবং এজন্যে তাদের সর্বশক্তি তারা নিয়োগ করে। অর্থাৎ ইসলামের মূল দ্বন্দ্ব্ব ছিল নেতৃত্ব নিয়ে। প্রকৃতপক্ষেই যেকোন মতাদর্শের বিজয়ের জন্য নেতৃত্বই মুখ্য। তবে এই প্রতিকূলতাও মুসলমানদের পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল। তাই সবদিক দিয়েই ইসলামের জন্য আরব ভূমির উর্বরতা স্বতঃসিদ্ধ।

সূরা আল ফাতিহা




(1) সূরা আল ফাতিহা (মক্কায় অবতীর্ণ), আয়াত সংখ্যা 7



Ayahs:   | 1-7 |





بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ
 (1

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু


In the Name of Allâh, the Most Beneficent, the Most Merciful.





الْحَمْدُ للّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
 (2

যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তাআলার যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা


All the praises and thanks be to Allâh, the Lord of the ’Alamîn (mankind, jinns and all that exists).





الرَّحْمـنِ الرَّحِيمِ
 (3

যিনি নিতান্ত মেহেরবান ও দয়ালু


The Most Beneficent, the Most Merciful.





مَـالِكِ يَوْمِ الدِّينِ
 (4

যিনি বিচার দিনের মালিক


The Only Owner (and the Only Ruling Judge) of the Day of Recompense (i.e. the Day of Resurrection)





إِيَّاكَ نَعْبُدُ وإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
 (5

আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি


You (Alone) we worship, and You (Alone) we ask for help (for each and everything).





اهدِنَــــا الصِّرَاطَ المُستَقِيمَ
 (6

আমাদেরকে সরল পথ দেখাও,


Guide us to the Straight Way





صِرَاطَ الَّذِينَ أَنعَمتَ عَلَيهِمْ غَيرِ المَغضُوبِ عَلَيهِمْ وَلاَ الضَّالِّينَ
 (7

সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছতাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে